৩৫০ বছরের ঐতিহ্য অটুট, সাড়ম্বরে পালিত হল বারুইপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির ঐতিহাসিক রথযাত্রা

ALN NEWS DESK
ALN NEWS DESK
Updated : Jul 16, 2026, 11:57 AM IST
4 min read
  • linkedin
  • twitter
  • facebook
  • instagram
  • whatsapp

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে এবছরও ভক্তি, আচার এবং উৎসবের আবহে পালিত হল রায়চৌধুরী বাড়ির ঐতিহাসিক রথযাত্রা।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে এবছরও ভক্তি, আচার এবং উৎসবের আবহে পালিত হল রায়চৌধুরী বাড়ির ঐতিহাসিক রথযাত্রা। রথযাত্রা উপলক্ষে সকাল থেকেই রায়চৌধুরী বাড়ি এবং সংলগ্ন রাস ময়দান ভরে ওঠে হাজার হাজার ভক্ত, দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীর সমাগমে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও বহু মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা দেখতে বারুইপুরে আসেন।

রথযাত্রার এই ঐতিহ্য শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অঙ্গ। বারুইপুরের রথযাত্রা মূলত শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পুনরুজ্জীবিত করে।

ইতিহাস অনুযায়ী, জমিদার রাজবল্লভ রায়চৌধুরী স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর নিজের বাড়িতেই শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকেই শুরু হয় এই রথযাত্রার প্রচলন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫০ বছর ধরে রায়চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে একই রীতি-নীতি ও ধর্মীয় আচার মেনে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। সময় বদলেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি।

রথযাত্রার দিন বিশেষ পূজা, মন্ত্রোচ্চারণ, আরতি ও ভোগ নিবেদনের পর সুসজ্জিত রথে আরোহন করানো হয় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে। এরপর ভক্তদের উপস্থিতিতে শুরু হয় রথ টানার অনুষ্ঠান। রথের দড়িতে একবার হাত রাখার জন্যও ভক্তদের মধ্যে ছিল প্রবল উৎসাহ। অনেকের বিশ্বাস, নিষ্ঠার সঙ্গে রথ টানলে জীবনে শুভ ফল লাভ হয় এবং মনস্কামনা পূরণ হয়।

এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে রায়চৌধুরীদের ঐতিহ্যবাহী রাস ময়দানে বসেছে বিশাল মেলা, যা প্রায় এক মাস ধরে চলবে। মেলায় রয়েছে খেলনা, পোশাক, গৃহস্থালির সামগ্রী, হস্তশিল্প, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও খাবারের দোকান। বিশেষ করে গরম জিলিপি, ভাজা বাদাম এবং নানা ধরনের মুখরোচক খাবারের দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থাও মেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

বারুইপুরের এই রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একসময় এই রায়চৌধুরী বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী-এর একটি বড় অংশ এখানেই রচিত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। ফলে এই বাড়ির সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি সাহিত্য-ইতিহাসেরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

পুরীর জগন্নাথধামের রথযাত্রার মতোই বারুইপুরের এই ঐতিহাসিক রথযাত্রাও প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, লোকসংস্কৃতির রঙ এবং শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের সমন্বয়ে এই উৎসব আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা ও যান নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে ভক্তদের কোনো অসুবিধা না হয়।

শতাব্দীপ্রাচীন এই রথযাত্রা আজও বারুইপুরের গর্ব। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং লোকজ সংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধনে রায়চৌধুরী বাড়ির রথযাত্রা প্রতি বছরই নতুন প্রজন্মকে বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

বারুইপুরের রথযাত্রা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিশেষ আবেগ ও উৎসাহ দেখা যায়। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে, এই রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অংশ। রথযাত্রার সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেমন নাটক, গান ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়, যা দর্শকদের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি করে।

রথযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয় মাসখানেক আগে থেকেই। রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা মূর্তিগুলোর সজ্জা, রথের নির্মাণ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করেন। রথটি সাধারণত কাঠের তৈরি এবং এটি বিভিন্ন রঙের কাপড় ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়। রথের গঠন ও ডিজাইনও প্রতিবারই কিছুটা ভিন্ন হয়, যা দর্শকদের জন্য নতুনত্ব নিয়ে আসে।

রথ টানার সময় ভক্তদের মধ্যে যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা সত্যিই অভূতপূর্ব। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, রথ টানার মাধ্যমে তাঁরা দেবতার আশীর্বাদ লাভ করেন। এই সময়ে ভক্তদের মধ্যে একধরনের ঐক্যবোধ তৈরি হয়, যা এই রথযাত্রাকে আরও বিশেষ করে তোলে।

রথযাত্রার সময় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। স্থানীয় পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেন। যানজট এড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।

ঐতিহ্যবাহী এই রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। মেলা উপলক্ষে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পান, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা স্থানীয় হস্তশিল্প এবং খাবারদাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা স্থানীয় শিল্পীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

রথযাত্রার এই ঐতিহ্য বারুইপুরের মানুষের মধ্যে এক প্রকার গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই রথযাত্রার গুরুত্ব বোঝাতে স্থানীয় স্কুলগুলোতেও বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু করা হয়েছে। এতে করে শিশুদের মধ্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

বারুইপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির রথযাত্রা শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়, বরং এটি একটি সামাজিক মিলনমেলা, যেখানে মানুষ একত্রিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে। এই রথযাত্রা তাদের জীবনে একটি নতুন আশা ও আনন্দের সূচনা করে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে মুক্তি দেয়।

অতীতে এই রথযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ উপস্থিত থাকতেন, যা এই উৎসবের বৈচিত্র্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানেও সেই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করেন।

বারুইপুরের রথযাত্রা উপলক্ষে স্থানীয় সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে, যাতে করে এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটির সঠিকভাবে উদযাপন করা যায়। স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন বিভাগকে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশনা দেয়, যাতে করে ভক্তদের কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়।

রথযাত্রার সময় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমও এই উৎসবের ওপর বিশেষ নজর রাখে। তারা রথযাত্রার প্রস্তুতি, মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা অনেকের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করে। এইভাবে, বারুইপুরের রথযাত্রা একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিটি বছর নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

Get More Updates

To learn more about the latest developments in Religious Events, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.

Related News