ইরানে নতুন করে হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলার পর ইরানের পাল্টা আক্রমণের কথা জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার "তাৎক্ষণিক জবাব" দেওয়ার ঘোষণা আগেই দিয়ে রেখেছিল ইরান।
নতুন দিল্লি, ভারত ৯ জুল, ২০২৬ ALN: একদিন আগেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় "কঠোরভাবে আঘাত" করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তার ঠিক পরপরই ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানে টানা দ্বিতীয় রাতের হামলায় তারা সেখানে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এই হামলার ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর একটি গুরুতর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এক্সে প্রকাশিত তাদের একটি পোস্টে বিমান হামলার ভিডিও সংকলনও যুক্ত রয়েছে। সেন্টকম বলেছে, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল "হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করা।" এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে তাদের সামরিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে।
লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণস্থল, নৌ সক্ষমতা এবং ইরানের উপকূলজুড়ে সামরিক রসদ অবকাঠামো। সেন্টকম বলেছে, "সর্বশেষ এই হামলাগুলো ইরানে আগের রাতের সফল আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার পরবর্তী পদক্ষেপ।" এ ধরনের হামলার ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং তাদের আক্রমণের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সর্বশেষ হামলার পর ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে লিখেছেন, "গতকাল জাহাজগুলোতে ইরানের বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এটি করা হয়েছে। যদি এমনটা আবারও ঘটে, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে!" ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইরানের বিরুদ্ধে তার প্রশাসনের কঠোর নীতির প্রতিফলন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দর শহর সিরিক এবং বন্দর আব্বাসসহ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। উপকূলীয় শহর কোনারাক ও চাবাহারের বিভিন্ন স্থানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানা গেছে। এই বিস্ফোরণের ফলে ইরানের সামরিক স্থাপনার উপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বন্দর আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়াও সিরিক ও জাস্ক বন্দরে দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। হামলার পর ইরানকে পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানি হামলার কথা জানিয়েছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণ, কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার খবর এবং কাতারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে যে, তারা রাতভর কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তারা এই হামলাকে "আমেরিকার চুক্তিভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক জবাবের প্রথম ধাপ" বলে উল্লেখ করেছে এবং সতর্ক করে বলেছে, "আগ্রাসন" অব্যাহত থাকলে অঞ্চলের অন্য মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও হামলার আওতায় আনা হবে।
এদিকে বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প "ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ" বলার পর, এশীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৯ ডলারে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আবারও ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। এই অঞ্চলের সামরিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানিয়ান ব্রডকাস্টিং এজেন্সি জানিয়েছে যে, সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশের ইরানশাহর বিমানবন্দরের একটি ভবন ও রানওয়েতে বিস্ফোরণের পর শহরটির আকাশে ধোঁয়া দেখা গেছে। এই ঘটনা ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সিস্তান ও বেলুচেস্তানের ডেপুটি গভর্নর এবং ইরানশাহরের গভর্নরের বরাত দিয়ে আইআরএনএ শহরের বিমানবন্দর স্থাপনায় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে যে, এই ঘটনায় একজন দমকলকর্মীও নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনসমর্থন কমতে পারে।
আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। এই দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। এই ধরনের হামলা দ্বীপটির মালিকানা বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর আব্বাসে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো জানা যায়নি। তবে চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এর একটি ব্যারাক ও দপ্তরে আগুন লাগার কথা জানিয়েছে ইরানের গণমাধ্যম।
ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, চাবাহারে বিচ্ছিন্ন তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি দ্রুত সচল করা হয়েছে এবং তৃতীয়টিও শিগগিরই সচল হবে। এই ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতির ফলে ইরানের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
বুধবার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, "আমরা তাদের খুব শক্তভাবে আঘাত করেছি। আমি বলব, আমরা তাদের ২০ গুণ বেশি আঘাত করেছি।" ট্রাম্পের এই বক্তব্য যুদ্ধের পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।
তিনি আরও বলেন, "তারা যতবার আমাদের ওপর হামলা করে, আমরা তাদের ওপর ২০ গুণ বেশি আঘাত হানি।" এই বক্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার প্রশাসনের কৌশলগত অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছেন।
তিনি এটাও দাবি করেন, ইরান "কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল" এবং তারা "খুবই মরিয়া হয়ে" একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। এই ধরনের বক্তব্য ইরানের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলতে পারে।
"আমি জানি না তারা কোনো চুক্তি করার যোগ্য কি না- সমস্যা হলো, আমি জানি না তারা চুক্তির সম্মান রাখবে কি না," ট্রাম্প আরও বলেন। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইরানের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের অবিশ্বাসকে প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে তারা "শক্তিশালী" হামলা চালিয়েছে। এই হামলার ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ১৭ই জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর গত মঙ্গল থেকে বুধবার পর্যন্ত সময়টি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের। এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, গত মাসে ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন "ভেঙে গেছে"। তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র "গত রাতে তাদের ওপর খুব কঠিন আঘাত করেছে" এবং "সম্ভবত আজ রাতেও তাদের কঠোরভাবে আঘাত করা হবে।"
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "আমি তাদের সাথে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা জঘন্য। আপনি জানেন জঘন্য কারা? তারা জঘন্য। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।"
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, "আমরা অশ্লীলতার জবাব অশ্লীলতা দিয়ে দিই না, বরং কাজের মাধ্যমে জবাব দিই- নির্ভীকভাবে এবং বীরত্বের সাথে।" এই মন্তব্য ইরানের প্রতিরোধের মানসিকতার প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ওই চুক্তিতে ১৪টি পয়েন্ট ছিল, যার মধ্যে অন্যতম হলো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি- যার মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার শর্তও ছিল চুক্তিতে। তবে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি, তবুও ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, আরও আলোচনা করা "সময়ের অপচয়" ছাড়া আর কিছুই নয়।
উল্লেখ্য, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এটিই প্রথম হামলা নয়। এর আগে গত ২৬শে জুন হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছিল।
পরবর্তীতে ২৭শে জুন একটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় আবারও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। যদিও ওই মাসের শেষের দিকে উভয় পক্ষই "শান্ত থাকার" ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল।
এই পরিস্থিতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং বৈশ্বিক শক্তির মধ্যে নতুন দ্বন্দ্বের সূচনা হতে পারে।
এছাড়া, এই সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
To learn more about the latest developments in Political Controversies, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.