পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, বিশ্বের ৩৬টি দেশে জিনপিংয়ের প্রতি বেশি আস্থা রয়েছে, তবে ভারতের পরিস্থিতি ভিন্ন।
নতুন দিল্লি, ভারত ১৬ জুল, ২০২৬ ALN: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বিশ্ববাসীর আস্থা নিয়ে একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে যা বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তনশীল গতিবিধিকে প্রতিফলিত করে। পিউ রিসার্চ সেন্টার কর্তৃক পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৬টি দেশের মধ্যে অধিকাংশ দেশের জনগণ শি জিনপিংয়ের প্রতি ট্রাম্পের তুলনায় বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন।
এই সমীক্ষাটি ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের জনগণের মতামত সংগ্রহ করা হয়। ফলাফল অনুযায়ী, ২২টি দেশের জনগণ শি জিনপিংকে বেশি বিশ্বাস করে। এই দেশগুলোর মধ্যে কানাডা, স্পেন, ইটালি, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ব্রিটেন উল্লেখযোগ্য। এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিছু বছর আগে এই দেশগুলি আমেরিকার প্রতি বেশি বিশ্বাসী ছিল। উদাহরণস্বরূপ, কানাডায় ২০২৩ সালে মাত্র ৩৩ শতাংশ মানুষ ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থা রেখেছেন, যা ২০২০ সালে ছিল ৫৭ শতাংশ।
এই পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিশ্ব রাজনীতিতে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং অর্থনৈতিক শক্তি। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে, চিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, "বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ" প্রকল্পের মাধ্যমে চিন বিভিন্ন দেশের সাথে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চিনের অর্থনীতি কেবল নিজের দেশেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়, মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি অনেকটাই একপেশে হয়ে উঠেছিল, যেখানে আমেরিকার স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে, যেমন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং ইরান পারমাণবিক চুক্তি। এই ধরনের পদক্ষেপগুলি অনেক দেশের মধ্যে আমেরিকার প্রতি আস্থা কমিয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়, আমেরিকার বিদেশী নীতির অঙ্গীকার এবং সহযোগিতার অভাব অনেক দেশের কাছে একধরনের আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে, যদিও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, তবে এখনও তিনি জিনপিংয়ের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ভারতের জনগণের মধ্যে চিনের প্রতি আস্থা তুলনামূলকভাবে কম থাকার পেছনে গালওয়ান সংঘর্ষ এবং সীমান্ত বিবাদের মতো বিষয়গুলি একটি বড় কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে এবং দেশটি আমেরিকার প্রতি একটি নির্ভরশীলতা বজায় রাখতে চায়। ভারত, যা দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান শক্তি, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকার সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছ’টি দেশ যেমন জাপান, ইজরায়েল, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স এবং পোল্যান্ড এখনও আমেরিকার উপরই বেশি আস্থা রেখেছে। এই দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে আমেরিকার প্রতি আস্থা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া, যারা নিরাপত্তা সহযোগিতায় আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। এই দেশগুলোর জন্য, আমেরিকার সাথে সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে যখন তারা চীনের সামরিক শক্তি এবং প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করতে চায়।
বিশ্বের এই পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ তৈরি করছে। বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থান এবং তাদের আস্থার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। এই পরিবর্তনগুলি কেবলমাত্র রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সমীক্ষা শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রশ্ন নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীলতা এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন। এই পরিবর্তনগুলি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে, বিশ্ব রাজনীতির এই পরিবর্তনশীলতা কেবল একটি তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা করছে।
এছাড়া, চলমান বৈশ্বিক সংকট, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা,ও এই পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ। এই সংকটগুলির মোকাবিলা করতে দেশগুলোকে একত্রিত হতে হবে, এবং এর ফলে নতুন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জাল গড়ে উঠতে পারে। এই সংকটগুলির মধ্যে সহযোগিতা এবং সমন্বয় ছাড়া কোনো দেশই কার্যকরীভাবে এগিয়ে যেতে পারবে না, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন দিক নির্দেশনা দিতে পারে।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্প এবং জিনপিংয়ের তুলনায় বিশ্ববাসীর আস্থা একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তনগুলি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, দেশগুলোর মধ্যে আস্থা এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
এই সমীক্ষার ফলাফলগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বিশ্ব রাজনীতিতে চিনের প্রভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি আমেরিকার অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থানগুলি ভবিষ্যতে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। এটি স্পষ্ট যে, বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি এখন নতুন এক দিগন্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণ করছে।
এখন দেখার বিষয় হলো, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি কেমন হয় এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থান কিভাবে রূপ নেবে। বিশ্ববাসীর আস্থা এবং তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসের পরিবর্তনগুলি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। এই পরিবর্তনগুলি ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
To learn more about the latest developments in Public Opinion & Analysis, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.