বর্ধমান | ‘ঢেঁড়া পিটিয়ে’ চাষ বন্ধের ফতোয়া! বিজেপির বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ

ALN NEWS DESK
ALN NEWS DESK
Updated : Jul 19, 2026, 11:55 PM IST
5 min read
  • linkedin
  • twitter
  • facebook
  • instagram
  • whatsapp

পূর্ব বর্ধমানে বিজেপির বিরুদ্ধে চাষ বন্ধের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় চাষিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, দাবি করেছেন চাষাবাদ বন্ধের নির্দেশ বিজেপির মণ্ডল সভাপতির।

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: মধ্যযুগে ‘ঢেঁড়া পিটিয়ে’ ঘোষণা করা হত রাজকীয় কোনও বার্তা। আর এখন বিজেপির তরফে ‘ঢেঁড়া’ পিটিয়ে ‘ফতোয়া’ জারি করে চাষিদের কয়েকশো বিঘা জমিতে বন্ধ করে দেওয়া হল চাষাবাদ! এমন ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁষছেন পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়া গ্রামের চাষিমহল। তাঁদের কথা অনুযায়ী, শুধু ঢেঁড়া পেটানোই নয়, চাষ বন্ধের ফতোয়ার কথা সাদা কাগজের উপর লিখে তা গ্রামের বিভিন্ন দেওয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই কাগজে বিজেপির স্থানীয় ৬ জন বুথ কমিটি সদস্যের নাম এবং মণ্ডল সভাপতির কথাও উল্লেখ ছিল। বিজেপি নেতাদের এমন কীর্তির কথা জানাজানি হতেই রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

অভিযোগ, বিজেপির নাম করে লেখা ওই ’পোস্টারে’র মাধ্যমে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ৯ জুলাই থেকে জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়ার নদীর ধার থেকে ঝাপানতলা পর্যন্ত জমির চাষআবাদ বন্ধ থাকবে। এটা নাকি বিজেপির মণ্ডল সভাপতির নির্দেশ। কেউ পার্টির নির্দেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমন নির্দেশ সংক্রান্ত পোস্টারে এলাকার বুথ কমিটির সদস্য উত্তম কোলে, বাপি কোলে, স্বপন বেরা, গৌতম বেরা, মুরারী পোড়েল ও মেঘনাথ পোড়েলের নাম লেখা রয়েছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, পোস্টারে যে মণ্ডল সভাপতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর নাম অসীম শীল ওরফে সন্তু। তিনি জামালপুর বিধানসভার ৩ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি।

এই বিষয়ে জোৎচাঁদ গ্রাম নিবাসী সুকুমার মান্না পুলিশকে তাঁর অভিযোগে জানিয়েছেন (জিডি নম্বর:৫৫৫), বিজেপির তরফে ঢেঁড়া পিটিয়ে চাষআবাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারা জমিতে এখন ট্রাক্টরও নামতে দিচ্ছে না। জমিতে নামলে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।

সুকুমারের দাবি, গত বৃহস্পতিবার তিনি জমিতে নেমেছিলেন। তা জানতে পেরেই উত্তম কোলে ও মুরারী পোড়েল কাটারি হাতে নিয়ে জমিতে চলে আসে। জমিতে নামার জন্য তারা তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। ভয়ে তিনি জমি ছেড়ে পালিয়ে যান।

একই এলাকার অপর চাষি নবকুমার মান্না বলেন, “চাষ বন্ধ করে দিয়ে বিজেপির লোকজন ‘তোলা’ চাইছে। এই সবকিছুই বিজেপির মণ্ডল সভাপতির ইন্ধনে হচ্ছে। ওরা ট্রাক্টরের চালকদেরও জমিতে নামতে নিষেধ করে দিচ্ছে। যাঁরা ‘তোলা’ দিতে পেরেছে তাঁরাই শুধু এখন চাষ করছে।” আর এক চাষি তোতন মান্না বলেন, “আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। কিন্তু এরকম পরিবর্তন আমরা চাইনি। চাষ বন্ধ করে দিয়ে এখন শুধু তোলাবাজি চলছে।”

চাষিদের আনা এইসব অভিযোগের বিষয়ে মণ্ডল সভাপতি অসীম শীল ওরফে সন্তুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “উত্তম কোলে আমাদের দলের বুথ সভাপতি। ওই এলাকায় খাস জমি রয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ হয়েছে, সে সব না জেনে কোনও মন্তব্য করব না।” পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ওই ’পোস্টার’ বিজেপির ছেলেরা লেখেনি। তৃণমূল চক্রান্ত করে এসব লিখেছে।

ঘটনা প্রসঙ্গে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল জানান, “চাষিদের সাথে এমন আচরণ আমরা কখনোই মেনে নেব না। গোটা ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। কেউ অন্যায় ভাবে চাষিদের চাষ করা বন্ধ করে দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এলাকার চাষিদের সাথে হওয়া অন্যায় অত্যাচার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিপিএমের কৃষক সংগঠন, সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য কমিটির সদস্য বিনোদ ঘোষ। তিনি বলেন,“তৃণমূল রাজত্বে কৃষকদের উপর অত্যাচার, অবিচার ও শোষন কম হয়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে বাংলায় ক্ষমতায় আসা বিজেপির রাজত্বে কৃষকরা এখন আরও বেশী অন্যায়,অত্যাচার ও জুলুমবাজির শিকার হচ্ছেন। মকুল রায় একদা বলেছিলেন, বিজেপি মানেই তৃণমূল। তার বাস্তব প্রতিফলন এখন দেখতে পাচ্ছেন জামালপুরের চাষিরা।”

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইস্যু, যা বাংলার কৃষকদের জীবনযাত্রার উপর গভীর প্রভাব ফেলবে। কৃষির উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে চাষিরা যে সংকটে পড়ছেন, তা তাদের জীবিকা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুইকেই বিপন্ন করছে। কৃষি একটি দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি, এবং কৃষকদের উপর এই ধরনের চাপ সৃষ্টি হলে তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা বহু বছর ধরে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থে কৃষকদের ব্যবহার করেছে, যা তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে কৃষকদের একত্রিত হওয়া এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? কৃষিমন্ত্রী এবং স্থানীয় প্রশাসন কি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? চাষিরা কি তাদের অধিকার ফিরে পাবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া এবং তাদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এই ঘটনার পর, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, এটি আগামী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। যদি কৃষকরা তাদের অধিকার রক্ষা করতে সক্ষম হন এবং রাজনৈতিক দলগুলি তাদের সমর্থন করে, তবে এটি একটি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, এই ঘটনা শুধুমাত্র জামালপুরের কৃষকদের জন্য নয়, বরং সমগ্র বাংলার কৃষি ক্ষেত্রের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কৃষকদের অধিকার এবং তাদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকরী পদক্ষেপের প্রয়োজন।

রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, কৃষকদের আন্দোলন অনেক সময় সরকারের নীতির পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। কৃষি আইন সংশোধন আন্দোলন, যা ২০২০ সালের শেষের দিকে শুরু হয়েছিল, তার একটি উদাহরণ। এই আন্দোলন ভারতজুড়ে কৃষকদের মধ্যে একতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করেছিল। জামালপুরের চাষিদের এই পরিস্থিতি সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হতে পারে, যদি তারা একত্রিত হয়ে তাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হন।

এছাড়া, এই ঘটনার ফলে স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্পর্কের ওপরও প্রভাব পড়বে। যদি বিজেপি এই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে তাদের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএম এই পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে।

অন্যদিকে, কৃষকদের মধ্যে এই ধরনের অভিযোগের উত্থান কৃষি নীতির প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করতে পারে। কৃষকদের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে কৃষি ক্ষেত্রে যে অব্যবস্থাপনা রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে পারে।

এটি একটি সময়োপযোগী সুযোগ হতে পারে কৃষকদের জন্য, যাতে তারা তাদের অধিকার এবং দাবি নিয়ে আরও বেশি সচেতন হন। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে এই ধরনের ঘটনাবলী তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।

অবশেষে, এই ঘটনা বাংলার কৃষকদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলতে পারে, যদি তারা সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হন। কৃষি এবং কৃষক সমাজের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ রয়েছে।

Get More Updates

To learn more about the latest developments in Political Controversies, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.

Related News