শিলিগুড়ি করিডর, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র সংযোগ, বর্তমানে চিনের ভূ-রাজনৈতিক চক্রব্যূহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নতুন দিল্লি, ভারত ১৮ জুল, ২০২৬ ALN: শিলিগুড়ি: মাত্র ২২ কিলোমিটারের এক চিলতে ভূখণ্ড, অথচ সেটাই উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র লাইফলাইন। শিলিগুড়ি (Siliguri) করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ নামের এই স্পর্শকাতর অঞ্চলকে ঘিরেই এবার ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক চক্রব্যূহ রচনা করছে বেজিং। নেপাল থেকে বাংলাদেশ— প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে আর্থিক অনুদানের টোপ দিয়ে ভারতের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে চিনা ড্রাগন। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, ভারতের এই সবচেয়ে দুর্বল অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকেন্দ্রের ওপর মরণকামড় বসানো। কিন্তু দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর নয়া ভারতও শত্রুর চোখে চোখ রেখে যোগ্য জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
শিলিগুড়ি করিডর কেবলমাত্র ভূ-রাজনৈতিক চক্রব্যূহের একটি অংশ নয়, বরং এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই লাইন। এই করিডর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে সেনা এবং সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানো হয়। এর ফলে, ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয় যখনই সীমান্তে কোনো অশান্তি ঘটে। করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারত সরকারের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
সামরিক মহলের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের উত্তরাংশে চিনের বিপুল মদতে গড়ে ওঠা তিস্তা রিভার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট। এই তথাকথিত নদী উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালেই করিডর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ঘাঁটি গাড়ছে চিনা প্রযুক্তিবিদ এবং রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংস্থার কর্মীরা। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আসল উদ্দেশ্য হলো গভীর ছদ্মবেশে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক নজরদারি চালানো। ভারতীয় সেনার গতিবিধি, বাঙ্কারের অবস্থান এবং রসদ সরবরাহের খুঁটিনাটি ব্লু-প্রিন্ট হাতিয়ে নিতেই এই গুপ্তচরবৃত্তির জাল পাতা হয়েছে।
চিনের এই কার্যক্রমের ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের নজরদারি কার্যক্রম ভারতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অবশ্যই এই পরিস্থিতিতে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
বিপদের এখানেই শেষ নয়। করিডর থেকে মাত্র ১৩৫ কিলোমিটার দূরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে চিন। ভারতের ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের ওপর নজরদারি চালাতে সেখানে চিনা সামরিক ড্রোন বা নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হতে পারে। যুদ্ধের সময় আকাশপথে ভারতের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতেই এই নিখুঁত চাল চেলেছে শি জিনপিংয়ের দেশ।
পূর্বদিকের পাশাপাশি পশ্চিম প্রান্তেও সমানভাবে বিষদাঁত ফোটাচ্ছে বেজিং। নেপালের সীমান্ত ঘেঁষে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দূরে ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে ‘দামাক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, ভারত-নেপালের প্রায় অরক্ষিত সীমানাকে কাজে লাগিয়ে এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটিকে কার্যত ভারত-বিরোধী হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছায়াযুদ্ধের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে চিনা গুপ্তচররা। এখান থেকেই উত্তরবঙ্গের বুকে অশান্তির আগুন জ্বালানোর ছক কষা হতে পারে।
চিনের এই আগ্রাসী কার্যক্রমের ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। প্রতিরক্ষা মহলের মতে, বেজিংয়ের এই আগ্রাসী রণনীতির আসল লক্ষ্য হলো, লাদাখ বা অরুণাচলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (LAC) সংঘাত বাধলে এই শিলিগুড়ি করিডরের টুঁটি চেপে ধরা। যাতে উত্তর-পূর্ব ভারতে সেনার অস্ত্র ও রসদ পৌঁছনোর পথ পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।
ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা কৌশলে এই পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট। শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তাকে নিশ্ছিদ্র করতে ইতিমধ্যেই আকাশপথে পাহারায় বসানো হয়েছে ঘাতক ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’ (S-400 Triumf) এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম। বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে সেনা ও আধুনিক সমরাস্ত্র। এছাড়া, যেকোনো পরিস্থিতিতে সেনার যাতায়াত সুরক্ষিত রাখতে মাটির তলা দিয়ে বিকল্প ও অভেদ্য রেললাইন বসানোর কাজও চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।
ভারতের এই প্রতিরক্ষা কৌশল শুধু সামরিক দিক থেকে নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এই পদক্ষেপগুলি সহায়ক হবে। ভারত সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনীতির মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চাচ্ছে, যাতে চিনের প্রভাব কমানো যায়।
ড্রাগন যদি ভারতের এই লাইফলাইনে থাবা বসানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে তার বিষদাঁত সমূলে উপড়ে ফেলতে যে ভারতীয় সেনা একপায়ে খাড়া, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং সরকারের প্রস্তুতি তাদের দৃঢ় সংকল্পের পরিচায়ক। তারা যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং দেশের নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
শিলিগুড়ি করিডরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব কেবল ভারত বা চিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উপর এই করিডরের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম এবং চিনের আগ্রাসী নীতি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এছাড়া, এই করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি, যেমন আসাম, মণিপুর, মিজোরাম এবং নাগাল্যান্ড, এই করিডরের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত। এই রাজ্যগুলির উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা অপরিহার্য।
ভারত সরকার ইতিমধ্যে এই করিডরের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমের উন্নতি করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ ভারতকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কৌশল গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার মাধ্যমে ভারত এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল করতে চায়। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এবং চিনের প্রভাব কমাতে এই পদক্ষেপগুলি সহায়ক হবে।
শিলিগুড়ি করিডরের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভারত সরকার ও সেনাবাহিনীর সদা প্রস্তুত থাকার মানসিকতা দেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
To learn more about the latest developments in Political Controversies, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.