বার্লিন ফেরত মেয়ে ইশারাতেই মা-বাবাকে বুঝিয়ে দিলেন একযুগের সংগ্রামের কথা।
কলকাতা, ভারত ১২ জুল, ২০২৬ ALN: কেটে গেছে ১২ বছর। ‘হারিয়ে যাওয়া’ মেয়ের ঘরে ফেরার আশার আলো যখন প্রায় ক্ষীণ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ঘটল মিরাকেল! একচালা টিনের ঘরে ফিরে এল মায়া। মা-বাবার চোখে কোণে আনন্দের অশ্রু চিকচিক করছে। কোথায় ছিল, কীভাবে ফিরল, হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে আসছে মনে। বার্লিন ফেরত মেয়ে ইশারাতেই মা-বাবাকে বুঝিয়ে দিলেন একযুগের সংগ্রামের কথা।
কোচবিহারের মায়া বর্মন। কোচবিহারের বক্সিরহাট থানা এলাকার বালাকুঠি গ্রামের বাসিন্দা। জন্ম থেকেই কানে শোনে না, বলতেও পারে না। বাবা খেতমজুরি করে সংসার চালাতেন। হঠাৎই একদিন মেয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। সালটা ২০১৪। ইশারায় মায়া জানালেন, পেটের টানে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলেন। স্টেশনে গিয়ে না জেনেই ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন। সেই ট্রেনেই উত্তর দিনাজপুর চলে যান। অচেনা জায়গায় গিয়ে পড়ে অসহায় মায়া স্টেশনে চত্বরেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করলেও মূক-বধির মেয়ের কাছ থেকে বাড়ি বা অন্য কোনও তথ্য পাওয়াও সম্ভব হয়নি। একরকম বাধ্য হয়েই সরকারি শিশু কল্যাণ কমিটির মাধ্যমে মায়াকে হাওড়ার বাগনানের একটা সরকারি হোমে পাঠানো হয়েছিল সে সময়। ১২ বছর সেখানেই কিশোরী থেকে তরুণী হয়ে ওঠা মায়ার।
মায়ার এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি শুধুমাত্র তার পরিবারের জন্যই নয়, বরং সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে, যারা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, তাদের জন্য এটি একটি বড় সংকট। পরিবারগুলি সাধারণত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে পড়ে যায়, এবং তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে। মায়ার বাবা-মা, যারা পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মায়ার বড়, তাঁরা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু মায়ার সন্ধান পাননি।
অন্যদিকে, মায়ার নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার পরিবার যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল, তা স্পষ্ট। বাবার খেতমজুরির আয় দিয়ে পাঁচজনের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। মায়ার ফিরে আসার আশা নিভতে নিভতে যেন হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল। সপ্তাহ দুয়েক আগেই বাবা মনোজ বর্মনের কাছে ফোন আসে। বক্সিরহাট থানার ওসি কপিলদেব রায় ফোন করে মনোকে জানান, তাঁর সেই মেয়েকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। আর এই খবর পাওয়া মাত্রই গোটা আনন্দে আত্মহারা পরিবার। এলাকার স্কুলশিক্ষককে সঙ্গে করে মনো ছোটেন হোমে মেয়েকে আনতে। সেখানে যেতেই তাজ্জব। হোম কর্তৃপক্ষ মনোকে দেখাতে থাকেন একটার পর একটা পদক। এ সব গুলোই নাকি মায়ার। ভলিবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেতা। গত কয়েক বছর ধরে দেশ-বিদেশের ভলিবল প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। ২০২৩ সালে জার্মানির বার্লিনে একটি স্পেশ্যাল অলিম্পিক্স ইভেন্টেও দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন মায়া। জিতেছেন সোনার পদক।
মায়ার এই সাফল্য শুধু তার নিজের জন্য নয়, বরং দেশের জন্যও গর্বের বিষয়। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ক্রীড়াবিদদের জন্য এটি একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য সুযোগের অভাব, এবং সামাজিক অবহেলার কারণে অনেকেই তাদের প্রতিভা বিকাশ করতে পারেন না। কিন্তু মায়ার মতো কিছু ক্রীড়াবিদ এই প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে সফলতার শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন।
কীভাবে মায়ার ঠিকানার খোঁজ পেল হোম কর্তৃপক্ষ? জানা গিয়েছে, সম্প্রতি মায়ার আধার কার্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই মতো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে আঙুলের ছাপ দেন মায়া। সেই আঙুলের ছাপের সূত্র ধরেই আধার কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন বহপবছর আগেই তাঁর আধার কার্ড হয়ে গিয়েছিল। আধারের ঠিকানা দেখামাত্রই সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করে মায়াকে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করে হোম কর্তৃপক্ষ। আদালতের অনুমতি নিয়ে গত বুধবার মায়াকে বাগনান থেকে ফেরানো হয় কোচবিহারের বাড়িতে।
মায়ার ফিরে আসার ঘটনা সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির সাহায্যে হারানো ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা সম্ভব। আধার কার্ডের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা এবং যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে একটি মডেল হতে পারে।
মায়ার পরিবার এখন শুধুমাত্র আনন্দিত নয়, বরং তাদের জীবনে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। মায়ার সাফল্যের গল্প তাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তারা আশা করছেন, মায়া তার প্রতিভাকে আরও বিকাশিত করবে এবং ভবিষ্যতে আরও সাফল্য অর্জন করবে।
মায়ার এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজের অন্যান্য সদস্যদেরও উচিত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রদর্শন করা। তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা, এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
মায়ার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রত্যেকেরই একটি গল্প রয়েছে, একটি স্বপ্ন রয়েছে, এবং আমাদের উচিত সেই স্বপ্নগুলোকে পূরণ করার জন্য সহায়তা করা। মায়ার মতো ক্রীড়াবিদরা আমাদের সমাজের গর্ব, এবং তাদের সাফল্য আমাদের সকলের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
মায়ার ফিরে আসার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি আশার আলো। এটি শুধু তার পরিবারকে নয়, বরং বৃহত্তর সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে, হারানো ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। আধার কার্ডের মতো প্রযুক্তি নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সমাজে যে ধরনের অবহেলা ও সংকট বিদ্যমান, সেই বিষয়টিও মায়ার গল্পের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রদর্শন করা, তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা, এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
মায়ার অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি মানুষের জীবনে সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। মায়ার মতো ক্রীড়াবিদরা আমাদের সমাজের গর্ব, এবং তাদের সাফল্য আমাদের সকলের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
এছাড়া, মায়ার ফিরে আসার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবার এবং সমাজের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যরা যখন একে অপরের পাশে থাকে, তখন তারা একসঙ্গে যে কোনও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। মায়ার পরিবারও সেই একই উদাহরণ। তারা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছে, কিন্তু তাদের আশা কখনও নিভে যায়নি।
মায়ার সাফল্যের মাধ্যমে সমাজে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি হবে, এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। এটি আমাদের সকলের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে যে, কঠোর পরিশ্রম এবং সংকল্পের মাধ্যমে যে কোনও কিছু অর্জন করা সম্ভব।
মায়ার ফিরে আসার ঘটনা আমাদের সকলকে আরও সচেতন করে তোলে যে, আমাদের সমাজে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সহানুভূতি এবং সমর্থন প্রদর্শন করা কতটা জরুরি। তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা এবং তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
মায়ার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রত্যেকেরই একটি গল্প রয়েছে, একটি স্বপ্ন রয়েছে, এবং আমাদের উচিত সেই স্বপ্নগুলোকে পূরণ করার জন্য সহায়তা করা। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা আমাদের সমাজের অমূল্য সম্পদ, এবং তাদের সাফল্য আমাদের সকলের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
To learn more about the latest developments in Society & Social Issues, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.