নবম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা নয়: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ

ALN NEWS DESK
ALN NEWS DESK
Updated : Jul 16, 2026, 05:41 PM IST
4 min read
  • linkedin
  • twitter
  • facebook
  • instagram
  • whatsapp

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নবম শ্রেণিতে নতুন ভাষা শেখার চাপ পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ পড়ুয়াদের ঘাড়ে নবম শ্রেণিতে উঠে নতুন কোনো ভাষা শেখার বাড়তি বোঝা চাপানো যাবে না—কেন্দ্রীয় সরকারের ‘তিন ভাষা নীতি’ (Three-Language) নিয়ে এবার এমনই কড়া পর্যবেক্ষণ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের। সিবিএসই (CBSE) যখন ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলকভাবে তৃতীয় ভাষা চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, এই সিদ্ধান্ত পড়ুয়াদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি করবে।

জাতীয় শিক্ষা নীতি মেনে সিবিএসই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নবম ও দশম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে। যদিও বোর্ড পরীক্ষায় এর লিখিত পরীক্ষা থাকবে না, কিন্তু স্কুলের ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টে এই তৃতীয় ভাষায় পাশ করা বাধ্যতামূলক। পাশ না করলে মিলবে না সেকেন্ডারি স্কুল এক্সামিনেশন পাশ সার্টিফিকেটও।

এই নিয়ম ঘিরেই তীব্র আপত্তি তোলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিভি নাগারত্ন। তামিলনাড়ু সরকারের দায়ের করা এক মামলার শুনানিতে তিনি স্পষ্ট বলেন: নবম শ্রেণি পড়ুয়াদের জন্য অত্যন্ত চাপের সময়। এই বয়সে এসে হঠাৎ একটা সম্পূর্ণ নতুন ভাষা কেন শিখতে যাবে ওরা? যদি তৃতীয় ভাষা শেখাতেই হয়, তবে তা ষষ্ঠ শ্রেণি (Class 6) থেকে শুরু করা উচিত। অষ্টম শ্রেণির শেষ থেকেই ছাত্রছাত্রীদের ওপর বোর্ড পরীক্ষার চাপ তৈরি হয়ে যায়।

নিজের স্কুলজীবনের উদাহরণ টেনে বিচারপতি জানান, তাঁদের সময়ে মিডল স্কুল থেকেই একাধিক ভাষা শেখানো হতো, যাতে মাধ্যমিকের সময় গিয়ে কোনো বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি না হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু পরিবেশে পড়াশোনা করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা তাদের সম্ভাবনা অনুযায়ী বৃদ্ধি পেতে পারে।

এই মামলার শুনানিতে দক্ষিণ ভারতে ভাষা বিতর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন বিচারপতি নাগারত্ন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, জাতীয় শিক্ষানীতিতে কোথাও তৃতীয় ভাষা হিসেবে ‘হিন্দি’ চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়নি। রাজ্যগুলো তাদের নিজস্ব পছন্দমতো ভাষা বেছে নিতে পারে। ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপটে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীতি একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তামিলনাড়ু সরকার যখন তিন ভাষা নীতির বিরোধিতা করে, তখন আদালত প্রশ্ন তোলে, আপনাদের হিন্দিতে আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু যদি তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত বা অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষা রাখা হয়, তবে কি আপত্তি থাকবে? কোনো রাজ্যের ওপর জোর করে কোনো ভাষা চাপানো যে অনুচিত, তাও মনে করিয়ে দেয় বেঞ্চ। এই মন্তব্যটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ভাষাগত সংবেদনশীলতার গুরুত্বকে তুলে ধরে, যেখানে প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে।

আপাতত দেশের সর্বোচ্চ আদালত কেন্দ্রীয় সরকার ও সিবিএসই-কে তাদের এই নীতি পুনর্বিবেচনা বা পর্যালোচনা করার জোরালো অনুরোধ জানিয়েছে। লাখ লাখ পড়ুয়ার ভবিষ্যতের স্বার্থে কেন্দ্র এই সিদ্ধান্ত বদল করে কি না, এখন সেটাই দেখার।

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের প্রতীক। তাই, একটি ভাষা শেখার ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। তবে, যখন শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত চাপ চাপানো হয়, তখন তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, অতিরিক্ত চাপের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই, সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের পেছনে রয়েছে ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত রয়েছে এবং প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব ভাষার প্রতি গভীর সম্মান রয়েছে। তাই, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির পেছনে যে উদ্দেশ্য রয়েছে, তা বাস্তবায়নের সময় রাজ্যগুলোর ভাষাগত চাহিদার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এছাড়া, এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষার প্রতি আগ্রহ এবং তাদের ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে, যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। তবে, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করতে পারে। এটি নিশ্চিত করবে যে, শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ মুক্ত এবং সুস্থ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে।

এখন কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত হবে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ মেনে নিয়ে তাদের নীতিকে পুনর্বিবেচনা করা। এর ফলে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এছাড়া, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতির গুরুত্বকে তুলে ধরার জন্য এটি একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং তাদের ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে রাজ্য সরকারগুলোকে তাদের নিজস্ব ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি এবং নীতিগুলি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

উল্লেখ্য, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা বহু বছর ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভাষার সমন্বয়ে গঠিত। এই বৈচিত্র্য দেশের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই, শিক্ষার্থীদের ভাষাগত শিক্ষা এবং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমর্থন করার জন্য একটি সঠিক নীতির প্রয়োজন রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশনার ফলে, সরকার এবং শিক্ষাবোর্ডগুলোর জন্য একটি নতুন পথের সূচনা হতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভাষাগত চাহিদার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হবে। এটি নিশ্চিত করবে যে, শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরে চাপ মুক্ত এবং সুষ্ঠু পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে, যা তাদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Get More Updates

To learn more about the latest developments in Crime & Law, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.

Related News