অক্ষয় কুমারের বিরুদ্ধে 'আইডিয়া চুরি' ও 'প্রতারণার' অভিযোগ তুললেন বর্ষীয়ান অভিনেতা পরেশ রাওয়াল।
কলকাতা, ভারত ১৬ জুল, ২০২৬ ALN: বিনোদন জগতের অন্দরে বিতর্কের কোনও শেষ নেই। কখনও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের স্বাধীনতা হরণ, তো কখনও টলিউড বা বলিউডের অন্দরের ঠান্ডা লড়াই— এই সব কিছু মিলিয়ে চলচ্চিত্র জগতের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সম্প্রতি বর্ষীয়ান অভিনেতা পরেশ রাওয়াল অক্ষয় কুমারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ২০২৩ সালের অন্যতম ব্লকবাস্টার ছবি ‘ওএমজি ২’-এর আসল কৃতিত্ব এবং গল্প তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল। তবে অক্ষয়ের এন্ট্রির পরেই নাকি রাতারাতি বদলে যায় ছবির চিত্রনাট্য, এমনকি পরেশ রাওয়ালকে কোনও ক্রেডিট পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
পরেশ রাওয়াল, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন, তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, তিনি ‘রোড টু সঙ্গম’ ছবির পরিচালক অমিত রাইয়ের সঙ্গে বসে এই ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন। পরেশের মতে, এটি কোনওভাবেই 'ওএমজি'-র সিক্যুয়েল বা ধর্মীয় ছবি হিসেবে ভাবা হয়নি। বরং, গল্পটি ছিল এক বাবা ও ছেলের লড়াইয়ের, যেখানে একটি স্কুলের ছেলের হস্তমৈথুনের ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় এবং সেই ছেলেকে আইনি ও সামাজিকভাবে বাঁচানোর লড়াইয়ে তাঁর বাবা নামেন।
পরেশ রাওয়াল তাঁর সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, মহাকাল মন্দিরের পুরোহিত চরিত্রটি তাঁর মূল ভাবনায় ছিল। তিনি চেয়েছিলেন যে ছেলেটির বাবা হোক এক টুরিস্ট গাইড। কিন্তু পরিচালক অমিতের পরামর্শে চরিত্রটিকে মহাকাল মন্দিরের পার্ট-টাইম পুরোহিত করা হয়। এই পরিবর্তনটি গল্পের মূল থিমের সঙ্গে একেবারে মিলছে না বলে পরেশের অভিযোগ।
পরেশের চিত্রনাট্যে কোনও ঈশ্বরের ব্যাপার ছিল না। বরং, এক বাইকার চরিত্র ছিল, যিনি সেই বাবাকে আইনি ও মানসিক লড়াইয়ে পথ দেখাতেন। পরেশের দাবি, তাঁরা ছবিটি এমনভাবে তৈরি করতে চেয়েছিলেন যাতে এটি শিক্ষণীয় অথচ বিনোদনমূলক হয়। তিনি জানান, দেশের প্রখ্যাত সেক্সোলজিস্ট ডঃ প্রকাশ কোঠারিকেও ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে ছবিতে কোনও নোংরামো বা অশ্লীলতা না থাকে।
পরেশ রাওয়াল আরও জানান, তিনি ইচ্ছে করেই অক্ষয় কুমারের কাছে যাননি, কারণ তিনি জানতেন যে অক্ষয় এলেই দর্শক ধরে নিত এটি 'ওএমজি ২', অথচ তাঁরা একটি সম্পূর্ণ নতুন ছবি বানাতে চেয়েছিলেন। বাইকার চরিত্রের জন্য তিনি অজয় দেবগণ এবং সলমন খানের কাছেও গিয়েছিলেন, কিন্তু ছবির বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তাঁরা রাজি হননি।
তাহলে অক্ষয়ের হাতে এ গল্পের চিত্রনাট্য গেল কীভাবে? পরেশের দাবি, চিত্রনাট্যের ওপর খসড়া হিসেবে ‘ওএমজি ২’ লিখে রেখেছিলেন পরিচালক অমিত রাই। সেই চিত্রনাট্য প্রযোজক অশ্বিন ভার্দের হাত ধরে পৌঁছে যায় অক্ষয় কুমারের কাছে। অক্ষয় সেই চিত্রনাট্যটি পড়া মাত্রই ছবিটি করতে রাজি হয়ে যান এবং এটিকে 'ওএমজি ২' ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।
ছবিটি যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ট্র্যাকে হাঁটতে শুরু করে, তখন পরেশ রাওয়াল নিজেকে এই প্রজেক্ট থেকে সরিয়ে নেন। তিনি বলেন, “অক্ষয় নিজে আমাকে ফোন করে ছবিতে অভিনয় করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু আমি সরাসরি না বলে দিই। আমি ওকে বলি— ‘এই ছবিটা আমি যেভাবে ভেবেছিলাম, তা নয়। এই গল্পে ঈশ্বরের কোনও ভূমিকাই ছিল না।’ আমি চিত্র্যনাট্যটার সঙ্গে শুরু থেকে জড়িয়ে ছিলাম, তাই আমার পক্ষে এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল।”
পরেশ সরে যাওয়ার পর তাঁর জন্য নির্ধারিত বাবার চরিত্রটি দেওয়া হয় পঙ্কজ ত্রিপাঠিকে এবং অক্ষয় কুমার পর্দায় হাজির হন ‘শিবের দূত’ হিসেবে। এই প্রজেক্ট থেকে সরে গেলেও পরেশ রাওয়ালের সবচেয়ে বড় দুঃখ রয়ে গেল যে ওঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু না দেওয়া। ছবিতে বা পোস্টারে কোথাও আইডিয়া বা কনসেপ্টের জন্য ওঁর নামটুকুও রাখা হয়নি। এ প্রসঙ্গে ক্ষোভের সুরে পরেশ বলেন, “সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল আমাকে একটা সামান্য ক্রেডিটও দেওয়া হয়নি। অথচ অমিত রাই, অক্ষয় কুমার, অশ্বিন ভার্দে, অজয় দেবগণ, করণ জোহর এবং সলমন খান— প্রত্যেকেই ভাল করে জানতেন যে এই ছবির আইডিয়া এবং এই গল্পটা পুরোপুরি আমার ছিল।”
এই পরিস্থিতিতে, ছবিটি মুক্তির আগে সেন্সর বোর্ডে অক্ষয় কুমারের ‘শিবের দূত’ চরিত্র এবং যৌন শিক্ষার মেলবন্ধন নিয়ে ব্যাপক আপত্তি তুলেছিল। শেষমেশ বহু কাটছাঁটের পর এটি ‘এ’ সার্টিফিকেট পায়। পরেশ রাওয়াল মনে করেন, যদি তাঁর আসল চিত্রনাট্য অনুযায়ী ছবি তৈরি হতো, তবে এই আইনি জট ও বিতর্কের মুখে ছবিটিকে পড়তেই হত না।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের অভিযোগ বিনোদন জগতের জন্য কতটা উদ্বেগজনক? পরেশ রাওয়ালের অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে এটি চলচ্চিত্র শিল্পে আইডিয়া ও ক্রেডিটের অধিকার নিয়ে একটি গুরুতর বিতর্কের সূচনা করবে। ক্রিয়েটিভ প্রকল্পগুলিতে এই ধরনের সমস্যা সাধারণত দেখা যায়, যেখানে বিভিন্ন শিল্পী ও নির্মাতাদের মধ্যে মতবিরোধ হতে পারে।
এই ধরনের পরিস্থিতি চলচ্চিত্রের সৃষ্টিশীলতা এবং শিল্পীদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এটি নিশ্চিতভাবেই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারে, যেখানে সঠিক ক্রেডিট এবং আইডিয়া সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম।
অবশ্যই, এই অভিযোগের প্রভাব শুধু পরেশ রাওয়াল এবং অক্ষয় কুমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি চলচ্চিত্র শিল্পের বৃহত্তর পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে, যেখানে শিল্পীরা নিজেদের কাজের জন্য যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি আশা করেন।
পরেশ রাওয়ালের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উচিত নিজেদের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং আইডিয়া এবং ক্রেডিটের বিষয়ে একে অপরকে সম্মান করা। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য একটি সঠিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে শিল্পীরা তাদের কাজের জন্য যথাযথ স্বীকৃতি পায়।
অবশেষে, এই বিতর্কটি বিনোদন জগতের অন্দরমহলে একটি নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে, যেখানে শিল্পীদের অধিকার এবং তাদের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা হবে। এটি নিশ্চিতভাবেই চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, ক্রিয়েটিভ কন্টেন্টের অধিকার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বহু আগে থেকেই শিল্পী এবং নির্মাতাদের মধ্যে এই ধরনের মতবিরোধ দেখা গিয়েছে। তবে পরেশ রাওয়ালের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই বিতর্কটি নতুন মাত্রা পেতে পারে। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া খুবই জটিল এবং এতে বহু মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। তাই, সঠিক ক্রেডিট দেওয়া এবং আইডিয়া সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনার ফলে, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে একটি নতুন ধরনের সচেতনতা তৈরি হতে পারে, যেখানে তারা নিজেদের কাজের প্রতি আরও দায়িত্বশীল এবং সম্মানজনক হতে চেষ্টা করবেন। শিল্পীদের মধ্যে সহযোগিতা এবং সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর জন্য এটি একটি সুযোগ হতে পারে।
পরেশ রাওয়ালের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে, এটি চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, যেখানে শিল্পীদের কাজের মূল্যায়ন এবং সম্মান দেওয়া হবে। এটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ এবং সঠিক করে তুলতে সাহায্য করবে।
অবশেষে, এই বিতর্কটি শুধু একটি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। শিল্পীদের অধিকার, তাদের কাজের মূল্যায়ন এবং সম্মান দেওয়ার বিষয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করবে।
To learn more about the latest developments in Celebrities & Influencers, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.