আলিপুরদুয়ার জেলার জুনিয়ার হাইস্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে, যার ফলে ১৫টি স্কুল বন্ধ হয়েছে।
কলকাতা, ভারত ১৮ জুল, ২০২৬ ALN: প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার: আলিপুরদুয়ার জেলার (Alipurduar) বড় অংশের জুনিয়ার হাইস্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমে গিয়েছে। একসময় জেলায় ১০১টি জুনিয়ার হাইস্কুল ছিল। পড়ুয়ার অভাবে ইতিমধ্যেই সেগুলির মধ্যে ১৫টি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা ৮৬টি স্কুলের মধ্যে প্রায় অর্ধেক স্কুলেই পড়ুয়ার সংখ্যা ৫০-এর নীচে বলে অভিযোগ। জেলার কিছু জুনিয়ার হাইস্কুলে এখনও কয়েকশো পড়ুয়া রয়েছে। তবে এগুলি বাদ দিয়ে অধিকাংশ স্কুলের বিদ্যালয়েই ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১০০–রও কম। পরিকাঠামোগত সমস্যার জেরেই বহু বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বড় অংশেও পড়ুয়া কমছে। একইভাবে জুনিয়ার হাইস্কুলগুলিতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্কুলগুলির হাল ফেরানোর দাবি জোরালো হয়েছে।
নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির সম্পাদক জয়ন্ত সাহা বলেন, ‘অনেক জুনিয়ার হাইস্কুল উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। একাংশ স্কুলে শিক্ষকসংকট তৈরি হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতও ভাবাচ্ছে। উৎসশ্রী প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে কিছু স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছে। স্কুলগুলিকে বাঁচাতে সরকারের সদর্থক পদক্ষেপ করা উচিত।’ জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) রবিনা তামাংকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
শিক্ষা দপ্তর ও শিক্ষক সংগঠন সূত্রে খবর, আলিপুরদুয়ার–১ ব্লকের কদমতলা জুনিয়ার হাইস্কুল, শিলবাড়িহাট স্পেশাল ক্যাডেট জুনিয়ার হাইস্কুল সহ জেলার বড় অংশের বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা একশোর নীচে নেমে এসেছে। আলিপুরদুয়ার শহরের অরবিন্দনগর জুনিয়ার হাইস্কুলে একসময় ৩০০-রও বেশি পড়ুয়া ছিল। পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৭-তে। বর্তমানে ধীরে ধীরে তা বেড়ে প্রায় ৫০ হয়েছে। কিন্তু স্কুলের সীমানা প্রাচীর না থাকায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। স্কুলটি রাস্তার ধারে হওয়ায় এখানে গৃহপালিত পশুর উপদ্রব বাড়ছে। অনেকসময় রাতে সেখানে নেশার আড্ডা বসারও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের একাংশ বিভিন্ন সময় সরব হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মহলে সীমানা প্রাচীর তৈরির আবেদন জানালেও সমস্যার সমাধান হয়নি। টিচার ইনচার্জ অজিতকুমার রায় বললেন, ‘পরিকাঠামোগত কিছু সমস্যার সমাধান হলেই স্কুলে পড়ুয়া বৃদ্ধি পাবে।’
জেলার অধিকাংশ জুনিয়ার হাইস্কুলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব রয়েছে। পরিকাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যার কারণেও পড়ুয়াদের আগ্রহ কমছে বলে অভিযোগ। জুনিয়ার হাইস্কুলে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠন হয়। নবম শ্রেণি থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। ফলে অনেক পড়ুয়া ও অভিভাবকের আগ্রহ শুরু থেকেই ওই স্কুলগুলির দিকেই বেশি। সম্প্রতি অতিরিক্ত শিক্ষকদের অন্যত্র বদলির নির্দেশিকা ঘোষণার পর পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষক মহলের দাবি, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার পরই অতিরিক্ত শিক্ষকদের বদলি করা হোক। অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের সম্পাদক পিরাজ কিরণের কথায়, ‘শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হলেই স্কুলগুলির সমস্যা অনেকটাই মিটবে। এছাড়াও স্কুলগুলিতে পরিকাঠামোগত সমস্যা থাকলে তা দেখা হবে।’ সংগঠনের তরফে এমন তালিকা তৈরি করে শিক্ষা দপ্তরে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।
এছাড়াও, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা মনে করছেন, স্কুলগুলির বর্তমান পরিস্থিতি শুধুমাত্র শিক্ষার মানের উপর নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশের উপরও প্রভাব ফেলছে। একদিকে যেখানে শিক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগ ও প্রকল্প রয়েছে, সেখানে সঠিকভাবে তা বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য বিভিন্ন স্তরের প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
আলিপুরদুয়ার জেলার অন্যান্য স্কুলগুলির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের অভাব, দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মানের প্রতি অসন্তোষ, এবং তৃতীয়ত, শিক্ষার পরিবেশের অস্থিতিশীলতা। এই সমস্ত কারণগুলো একত্রিত হয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
উপস্থিতি কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের পরিস্থিতি তাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সরাসরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এর ফলে জুনিয়ার হাইস্কুলগুলি আরও বিপর্যস্ত হচ্ছে।
শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের নিয়োগের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একইসঙ্গে, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যও কিছু প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রকল্পগুলোর কার্যকরীতা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, জুনিয়ার হাইস্কুলগুলির সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা দপ্তর এবং অভিভাবকদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা উচিত। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অভিভাবকরা তাদের উদ্বেগ জানাতে পারবেন এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারবেন।
এছাড়াও, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। যেমন, বিদ্যালয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের আয়োজন করা যাতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এই ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করতে সহায়তা করবে।
সর্বশেষে, আলিপুরদুয়ার জেলার জুনিয়ার হাইস্কুলগুলির সংকট সমাধানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি শিক্ষা দপ্তর এবং সমাজের অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, আলিপুরদুয়ার জেলার শিক্ষা স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য একটি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠন এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে একটি কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
এছাড়া, স্থানীয় সমাজের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হলে, তাদেরকে স্কুলগুলির সুবিধা এবং শিক্ষার মানের উপর সচেতন করতে হবে। স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষা দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মশালা এবং সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে অভিভাবকরা শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।
এটি স্পষ্ট যে, আলিপুরদুয়ার জেলার জুনিয়ার হাইস্কুলগুলির সংকটের সমাধান করতে হলে, একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাই কার্যকর হবে। শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকটের মোকাবিলা করা সম্ভব।
অতএব, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা দপ্তর এবং সমাজের অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে একটি কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার পরিবেশকে উন্নত করার জন্য এবং ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে, আলিপুরদুয়ার জেলার জুনিয়ার হাইস্কুলগুলি আবারও সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
To learn more about the latest developments in Education News, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.