সুপ্রিম কোর্ট সিবিএসই-র নতুন ত্রিভাষা নীতির ওপর স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছে। আদালত জানতে চেয়েছে, ইংরেজিকে দেশীয় ভাষা হিসেবে গণ্য করা যায় কি না।
নতুন দিল্লি, ভারত ১৫ জুল, ২০২৬ ALN: উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক : সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই (CBSE)-র নতুন ত্রিভাষা নীতির ওপর কোনও ধরনের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করতে অস্বীকার করল সুপ্রিম কোর্ট। তবে এই মামলার শুনানিতে কেন্দ্র ও সিবিএসই-র কাছে শীর্ষ আদালত জানতে চেয়েছে, ইংরেজিকে দেশীয় ভাষা হিসেবে গণ্য করা যায় কি না। ২২ জুলাই পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্র এবং সিবিএসই-কে এই বিষয়ে যাবতীয় তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বিশেষ বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। আদালত স্পষ্ট জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তিনটি ভাষা শিক্ষার যে নীতি সিবিএসই নিতে চলেছে, তার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের কোনও প্রয়োজন নেই। তবে ইংরেজিকে দেশীয় ভাষা হিসেবে গণ্য করা যায় কি না এবং তৃতীয় দেশীয় ভাষার নামকরণ নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করে আদালত।
সিবিএসই-র গত ৯ এপ্রিল এবং ৪ মে জারি করা তৃতীয় ভাষার সংযোজন সংক্রান্ত নতুন বিধিকে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতে মামলা দায়ের হয়েছিল। আবেদনকারীদের অভিযোগ, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সিবিএসই অনুমোদিত স্কুলগুলিতে দুটি ভারতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা পড়ুয়াদের নিজস্ব পছন্দের বিষয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আবেদনে আরও জানানো হয়, হঠাৎ করে এই নিয়ম চালু হলে স্কুলগুলিতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব দেখা দেবে। সব স্কুলে তিনটি ভাষা শেখানোর মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামোও নেই। এছাড়া এনসিইআরটি (NCERT) ১ জুলাইয়ের মধ্যে ২২টি ভাষার পাঠ্যবই প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিলেও, পড়ুয়ারা এখনও পর্যন্ত মাত্র তিনটি বই হাতে পেয়েছে বলে দাবি করেন আবেদনকারীরা।
অন্যদিকে, কেন্দ্র ও সিবিএসই-র পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল ঐশ্বর্যা ভাটি। তিনি জানান, আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে শীর্ষ আদালতে বিশদ রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020) মেনেই ভারতীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে এই শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সব বিষয়ে পড়ুয়ারা সমানভাবে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। সাংবিধানিক বিধি মেনে ভাষাশিক্ষা যাতে জাতীয় ঐক্যের প্রসারে সহায়ক হয়, সেই লক্ষ্যেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে। শুনানিতে কেন্দ্রের তরফে বিশেষ জোর দিয়ে জানানো হয়েছে যে, এই নীতির মাধ্যমে কোনও রাজ্যের ওপর জোর করে কোনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
ভারতে ভাষা শিক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। দেশটির সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, ভারত একটি বহুভাষিক দেশ, যেখানে ২২টি সংবিধানিক স্বীকৃত ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে হিন্দি এবং ইংরেজি প্রধান ভাষা হিসেবে গণ্য হয়। তবে, বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন ভাষার প্রচলন রয়েছে এবং স্থানীয় ভাষাগুলির গুরুত্বও কম নয়। সিবিএসই-র নতুন ত্রিভাষা নীতি মূলত শিক্ষার্থীদের ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
ত্রিভাষা নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং তাদের বহুভাষিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং জাতীয় ঐক্য বৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষকদের অভাব এবং পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাবের কারণে।
শিক্ষকরা যে ভাষাগুলি শেখানোর জন্য প্রস্তুত, সেগুলির উপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের ভাষা বাছাই করতে পারে। কিন্তু, যদি শিক্ষকদের অভাব থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা শেখা কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এনসিইআরটি-র ঘোষণার পর, যে ২২টি ভাষার পাঠ্যবই প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এই বিষয়টি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সমস্যা সৃষ্টি করছে। শিক্ষার্থীদের হাতে পর্যাপ্ত পাঠ্যবই না থাকলে, তারা নতুন ভাষা শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে।
সুপ্রীম কোর্টের এই সিদ্ধান্তটি সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের উপর চাপ রয়েছে যাতে তারা এই নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কার্যকরী শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে।
এছাড়া, আদালতের প্রশ্নের মাধ্যমে ইংরেজিকে দেশীয় ভাষা হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। অনেকেই মনে করেন যে, ইংরেজি একটি উপনিবেশিক ভাষা এবং এটি ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অন্যদিকে, ইংরেজি আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। তাই, ইংরেজির অবস্থান নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকবে।
ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দিক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষার প্রচলন রয়েছে, যা স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচায়ক। একদিকে, ভাষা শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে, অন্যদিকে, এটি তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বহুভাষিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
সুপ্রীম কোর্টের এই শুনানির প্রেক্ষাপট এবং এর ফলাফল, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। সরকার এবং সিবিএসই-কে এই নীতির বাস্তবায়ন করতে হলে, তাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যবই সরবরাহ এবং বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
এছাড়া, শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষার জন্য আরও বেশি উৎসাহিত করার প্রয়োজন রয়েছে। এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের ভাষা শেখার সুযোগ পায় এবং সেই ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
সর্বশেষে, এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ২২ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময় কেন্দ্র এবং সিবিএসই-কে আরও তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। এই বিষয়টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
To learn more about the latest developments in Education News, stay updated with our exclusive reports and analyses on AiLensNews.